লুণ্ঠিত মানবতার কারণে প্রায়ই খবর আসে পৃথিবীর আলো দেখার অভিযোগে অপরাধী হয়ে...

লুণ্ঠিত মানবতার কারণে প্রায়ই খবর আসে পৃথিবীর আলো দেখার অভিযোগে অপরাধী হয়ে নিরপরাধ নবজাতক হারিয়েছে প্রাণ।

46
SHARE

প্রতিনিধি,মোঃ হাবিবুর রহমান (সুজন) মানুষের অবয়বে পশুর তাণ্ডবে স্বীকার শিশুটি মানুষ হয়ে জন্মেও পড়ে থাকতে হচ্ছে কুকুরের পাহারায় কখনো বাঁশ বাগানে, আবার কখনো পরিত্যক্ত অবস্থায় কোন সড়কের পাশে। ফেলে যাওয়া ফুটফুটে, নিষ্পাপ জীবন্ত পরিত্যাক্ত শিশুটি ক্ষুধার্ত শিয়াল কুকুরের খাবার হয় অসহায় তখন মানবতার আকাশ। হিংস্র পশুর আঁচড়ে রক্তাক্ত যে প্রাণ, চিৎকার করে কাঁদে, মানবতাও তখন গুমরে কেঁদে উঠে নীরবে নিভৃতে। মানুষ নামের অসুর যখন মানবতা ও মনুষ্যত্বের বিষয়টি ভুলে গিয়ে নিজের পাপ ঢাকতে বলি দেয় নিজেরই গর্ভে ধরা অবুঝ মানবসন্তান। তখনই ঘটে মানবতার চরম বিপর্যয়। মানবতা’র যখন বড়ই অভাব তখন কবির ভাষায় বলতে হয় “মানবতা কেঁদে মরে রাজা থাকে চুপ, হা হা কারে চারপাশে কেঁপে ওঠে বুক! বৃহস্পতিবার, ১০ই-মে মো. রানা নামের এক পথচারী আনুমানিক সময় সকাল ১০ টার দিকে নিজ কর্মস্থলে যাওয়ার পথে দক্ষিনখান থানাধীন কাওলা এলাকার একটি ডাস্টবিন অতিক্রম করার সময় হঠাৎ কানে ভেসে আসে কান্নার সূর। অতঃপর তিনি ডাস্টবিনের কাছে গিয়ে দেখতে পায় একটি লাল ব্যাগে মোড়ানো সদ্যজাত এক মানব শিশু। নবজাতক ওই শিশুকে দেখা মাত্র তিনি দক্ষিণখান থানায় ফোন করে ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানায়। উক্ত ঘটনাটি জানার সাথে সাথে দক্ষিণখান থানার পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌছায় এবং শিশুটিকে উদ্ধার করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য কুর্মিটোলা হাসপাতালে নিয়ে যায়। শিশুটিকে দেখে চিকিৎসক পুলিশকে জানায়, শিশুটির একটি পা ভেঙে দুই টুকরো হয়েগেছে। হয়ত ডাস্টবিনে ফেলে যাবার সময় ব্যাগটি খুব জোরে শোরে ছুড়ে মারা হয়েছিল। বর্তমানে শিশুটির অবস্থা আশংকাজনক। চিকিৎসাধীন আবস্থায় রাতে শিশুটির অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত তাকে ঢাকা মেডিকেলে প্রেরণ করা হয়। এ বিষয়ে দক্ষিণখান থানা জোন এর সহকারী কমিশনার মিজানুর রহমান সত্যতা স্বীকার করে প্রতিবেদক কে জানায়, খবর পাওয়া মাত্র ঘটনাস্থলে আমাদের পুলিশ পৌছায় এবং শিশুটিকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে আমাকে আস্বস্থ করে। কিন্তু শিশুটির সারা শরীরে বড় বড় লাল পিপড়ার কামড়, নাকে মুখে ফেনা, সারা গায়ে পিপড়া আর পিপড়া”। সকালে ঘুম থেকে উঠেই ঢাকা মেডিকেলে গিয়ে বাবুটাকে দেখে আসি এবং চিকিৎসকের সাথে কথা বলি। বিলিরুবিন বেশি থাকায় বর্তমানে রেডিওথেরাপি দেওয়া হচ্ছে।তিনি বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে বাবুটিকে বাঁচানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছি। রাত্রে বাবুটির অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত ঢাকা মেডিকেলে প্রেরণ করা হয়। সকালে ঢাকা মেডিকেলে গিয়ে বাবুটাকে দেখে আসি। চিকিৎসকের সাথে কথা বলে জানতে পারি বিলিরুবিন বেশি থাকায় বর্তমানে রেডিওথেরাপি দেওয়া হচ্ছে। ভাবতেই অবাক লাগে কোন নরপশু এইভাবে একটি ফুট ফুটে, নিরপরাধ মানব সন্তানকে এত নির্মমভাবে ডাস্টবিনে ফেলে যেতে পারে। যে মা শিশুটিকে এতদিন গর্ভে ধারণ করলেন হঠাৎ কোন অপরাধের সাজা হিসেবে শিশুটি ঠাই পেলো ডাস্টবিনে। একজন “মা” হত্যা করল তারই বাগানের কলি। নিষ্পাপ শিশু তাই হিংসার বলি। শিশুটি ভাল-মন্দ, ন্যায়- অন্যায়, দোষ-গুণ, বাবা-মা, পৃথিবী ও পৃথিবীর মানুষ সম্পর্কে কিছু বুঝে উঠার আগেই কিছু কুলাঙ্গার নরপিশাচের কারণে আজ মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালের নার্স (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বলেন, এই বাবুটা আশরাফুল মাকলুকাতের সন্তান হিসেবে জন্ম নিয়ে আশরাফুল মাকলুকাত সম্পর্কে কি ধারণা পোষণ করবে? উল্লেখ্য, রাজধানীতে বিভিন্ন সময় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা নবজাতকের সংখ্যা দিনকে দিন বেড়েই চলছে। এর কারণ হিসেবে ধর্ষণ এবং অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ ছাড়াও দরিদ্রদের মধ্যে অপরিকল্পিত সন্তান প্রসবের বিষয়টি চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞগণ। প্রথম আলোর এক সূত্রে নারী ও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, সামাজিক অবক্ষয়ের কারণেই বিয়ে-বহির্ভূত অনেক ধরনের সম্পর্কে জড়িয়ে যাচ্ছে নারী-পুরুষ। ফলে এই নবজাতকদের জন্ম যেমন বেড়ে গেছে, তেমনি বেড়ে গেছে জীবন্ত নবজাতককে ফেলে দিয়ে সব দায় থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার ঘটনা। এতে করে নবজাতকের জন্মদাতা বাবা-মা হয়তো নিষ্কৃতি পাচ্ছেন, কিন্তু ফেলে দেওয়া নবজাতকের কপালে কি ঘটছে? আরও জানা যায়, বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের শিশু অধিকার পরিস্থিতি ২০১৭ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর রাস্তা/ডাস্টবিন বা ঝোপ থেকে অজ্ঞাতপরিচয়ের ১৭টি নবজাতক কুড়িয়ে পাওয়া যায়। ২০১৬ সালে ফেলে দেওয়া বা কুড়িয়ে পাওয়া নবজাতকের সংখ্যাটি ছিল ৯। অর্থাৎ এ সময়ে এ ধরনের ঘটনা বাড়ে ৮৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ। এ ছাড়া গত বছর অজ্ঞাতপরিচয়ের ২৪ শিশুর লাশ পাওয়া যায়, যার ৯৯ শতাংশই ছিল নবজাতক (জন্মের পর ২৮ দিন বয়স পর্যন্ত)। ইন্টারনেটের বরাত দিয়ে জানা যায়, ২০১৫ থেকে ২০১৭ সালে তিন বছরে ছোটমণি নিবাসে আশ্রয় পেয়েছে ৩৯টি শিশু। এর মধ্যে ১৯ নবজাতককে রাজপথে পাওয়া গেছে পরিত্যক্ত অবস্থায়। পূর্ব শেওড়াপাড়ার পুরনো বিমানবন্দর সংলগ্ন একটি মাঠে সিমেন্টের বস্তায় ভরে ফেলে গিয়েছিল ফাইজাকে। কুকুরের দল বস্তার ভেতর থেকে বের করে ঠোঁট ও নাকের বেশ খানিকটা অংশ খেয়ে ফেলে। বাঁ হাতের দুটি আঙুলের ডগাও চলে যায় কুকুরের পেটে। কয়েকজন নারী ওকে কুকুরের হাত থেকে উদ্ধার করেন। চলতি বছরেরই ১০ ফেব্রুয়ারি। ঢাকার আশুলিয়ায় এক নবজাতকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নবীনগর-কালিয়াকৈর সড়কের পাশে পলাশবাড়ী এলাকায় একটি ডাস্টবিন থেকে এই নবজাতকের লাশ তুলে নিয়ে তা কুকুরে খাচ্ছিল। চলতি বছরের গত ১৫ জানুয়ারির ঘটনাটি ঘটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। গাড়ি থামিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের ফটকের অদূরে পলিথিনে মোড়ানো কিছু একটা ফেলে যান এক তরুণী। পুলিশ ভাষ্য অনুযায়ী, ফেলে যাওয়া ভ্রূণটি চার-পাঁচ মাসের হতে পারে।একই বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারির রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ ঘাট থানা-পুলিশ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নে রাস্তার পাশ থেকে ওষুধের কাগজের কার্টন থেকে এক মৃত নবজাতকের লাশ উদ্ধার করে। তারও লাশ দাফন হয় বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে। এ ধরনের খবর দেখলেই মনে প্রশ্ন জাগে, কি দোষ ছিল এ নবজাতকের? সব কিছু দেখে শুনেও বিশ্ব বিবেক থাকছে চুপ। শিশুদের বিদারক কান্নার ধ্বনি, বিবেকের কানে পৌঁছে না। ওদের কান্না ওরাই কাঁদুক, মানবতা তুমি কেঁদো-না।