প্রতিবছর রমজানের যাকাত দেয়ার সময় নানা ধরনের দুর্ঘটনার ঘটে।

প্রতিবছর রমজানের যাকাত দেয়ার সময় নানা ধরনের দুর্ঘটনার ঘটে।

76
SHARE

প্রতিনিধি, মোঃহাবিবুর রহমান (সুজন) হুড়োহুড়ি করে যাকাতের কাপড় ও টাকা নিতে গিয়ে পদদলিত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে থাকে। স্বাধীনতা পরবর্তীতে এদেশে এ ধরনের দুর্ঘটনায় শতাধিক হতদরিদ্রের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে বেশিরভাগই বৃদ্ধা, নারী ও শিশু। দুর্ঘটনার পর নিহত ব্যক্তির পরিবারকে স্থানীয় প্রশাসন থেকে সামান্য কিছু আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়। এসব ঘটনায় স্থানীয়ভাবে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও একটির ঘটনায়ও কমিটির রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেনি। তদন্ত কমিটি ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে বেশ কিছু সুপারিশ দিলেও তা কোন সময়ই বাস্তবায়ন বা অনুসরণ করা হয়নি। কোন নিয়ম-নীতি না মেনেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর ধরে যাকাত প্রদান করে আসছেন। এদিকে, গতকাল চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় ইফতার সামগ্রী নিতে গিয়ে নিহতের ঘটনার কারণ হিসেবে অতিরিক্ত ভিড়ে হিটস্ট্রোকের কথা জানিয়েছে পুলিশ। যদিও এর আগে স্থানীয় একজন প্রতিনিধির পক্ষ থেকে পদদলিত হয়ে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানানো হয়েছিল। বিষয়টি নিশ্চিত করে সাতকানিয়া সার্কেলের এসপি জাসানুজ্জামান মোল্লা বলেন, ‘নিহতদের সবাই নারী। অতিরিক্ত ভিড়ে হিটস্ট্রোকে তাদের মৃত্যু হয়েছে।’ সোমবার সকাল ১০টার দিকে উপজেলার নলুয়া ইউনিয়নে মো. শাহজাহানের বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। সাতকানিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল আলম বিষয়টি নিশ্চিত বলেন, ধনাঢ্য ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শাহজাহান নামে একব্যক্তি সাতকানিয়ায় তার গ্রামের বাড়িতে যাকাত দিচ্ছেন-এমন খবরে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কমপক্ষে কয়েক হাজার নারী-পুরুষ স্থানীয় একটি মাদ্রাসা মাঠে জড়ো হন। এর মধ্যে গতরাত থেকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েছিলেন অনেকে।কিন্তু অতিরিক্ত মানুষের ভিড়ে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হিটস্ট্রোকে আট নারীর মৃত্যু হয়। পরে আরও দুইজনের মৃত্যু হয়েছে।’ চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (দক্ষিণ) এ কে এম এমরান ভূঁইয়া জানান, ‘৩০-৪০ হাজার মানুষ ইফতার সামগ্রী নিতে ওই বাড়িতে ভিড় করেন। চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও কক্সবাজার জেলা থেকে লোকজন সেখানে আসেন। অব্যবস্থাপনার কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।’ অপরদিকে, সাতকানিয়ার নলুয়া ইউনিয়নের ঘাটিয়া ডেঙ্গা এলাকায় ইফতারসামগ্রী নিতে গিয়ে হিটস্ট্রোক ও শ্বাসকষ্টে মারা গেছেন ৯ জন।সোমবার (১৪ মে) সন্ধ্যা সাতটায় নগরের আগ্রাবাদের কেএসআরএম কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এমন দাবি করে কেএসআরএম গ্রুপের সিইও মেহেরুন করিম বলেন, নিহতদের প্রত্যেককে তিন লাখ টাকা ও পরিবারের একজন সদস্যকে চাকরি দেবেন কেএসআরএম। মেহেরুন করিম বলেন, প্রতি বছরের মতো এবারও ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষকে ইফতার সামগ্রী ও জাকাত প্রদানের আয়োজন করা হয়। এজন্য সকাল ৮টায় সাতকানিয়ার নলুয়া ইউনিয়নের গাটিয়াডাঙ্গা গ্রামে জাকাত ও ইফতার সামগ্রী দেয়া শুরু করা হয়। কিন্তু সাড়ে ৯টার দিকে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় ৯ জন মহিলা ও শিশু মারা যায়। তিনি দাবি করেন, প্রথমে ১০ জন মারা যাওয়ার খবর শোনা যায়। কারণ সেখানে একজনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। তাই ১০ জন মারা গেছে বলে চালিয়ে দেয়া হয়। পরে তার সন্ধান পাওয়া যায়। অর্থাৎ, ৮ নারী এবং এক শিশু মারা গেছে। কেএসআরএম গ্রুপের সিইও বলেন, আমাদের কোনো অব্যবস্থাপনা ছিল না। পুলিশের ১০০ জন ও আমাদের সিকিউরিটির ২০০ জন সদস্য ত্রাণ বিতরণের সময় কাজ করেন। হিটস্ট্রোক, গরম ও শ্বাসকষ্টে এই ৯ জন মারা যান। এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন কেএসআরএম’র ডিজিএম সাখাওয়াত হোসেন ও কর্মকর্তা সৈয়দ নজরুল আলম।উল্লেখ্য, এই ঘটনায় ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ৭ কর্মদিবসের মধ্যেই এই কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে হবে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন। নিয়ম-নীতি অনুসরণ না করেই যাকাত প্রদানের ব্যাপারে পুলিশ সদর দফতরের একজন কর্মকর্তা জানান, নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি জেলায় কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যাকাত প্রদানের উদ্যোগ নিলে তা সংশ্লিষ্ট পুলিশ সুপারকে অবহিত করতে হবে। যাকাত প্রদানের দিন সেখানে পর্যাপ্ত পুলিশী নিরাপত্তা রাখতে হবে। যাকাত প্রদানের আগে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সেখানে যাকাত প্রদান করা যাবে কিনা-এ ব্যাপারে পুলিশ সুপারকে রিপোর্ট দিবে। পুলিশের এসব নিয়ম শুধু তাদের কাগজে-কলমে। বাস্তবে এর কোন প্রতিফলন নেই। এ কারণে প্রতিবছর যাকাত প্রদানের সময় পদদলিত হয়ে হতদরিদ্রদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। পুলিশের ওই কর্মকর্তা বলেন, যাকাত দেয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে স্থানীয় থানা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। অনুষ্ঠানের কমপক্ষে একদিন আগে সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপারকে বা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে তথ্য প্রদানের সুযোগ রয়েছে। মানুষের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য প্রত্যেক ব্যক্তিরই দায়িত্ব রয়েছে। নিরাপত্তা সংক্রান্ত একটি তথ্য গোপন করা হলে মানুষের জীবন বিপন্ন হতে পারে। সেজন্য তথ্য দিয়ে পুলিশি নিরাপত্তা সেবা গ্রহণের জন্য সবাইকে অনুরোধ করা হচ্ছে।