চ্যালেঞ্জের মুখে অর্থনীতি

চ্যালেঞ্জের মুখে অর্থনীতি

22
SHARE

নিউজ ডেস্ক:একদিকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে যাত্রা শুরু অন্যদিকে চরম অর্থ সংকট। এই দুই বিপরীতমুখী যাত্রায় বাংলাদেশ এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট দেশের অভ্যন্তরে অর্থনৈতিক ঝুঁকিকে মারাত্মক করে তুলেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, উন্নয়নশীল দেশের ক্যাটাগরিতে স্থান পাওয়া কেবল দেশের অভ্যন্তরের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাই বিচার হয় না। নানা সূচক, বিশেষ করে মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং জিডিপির সূচক বিচার করে এ
যোগ্যতা নির্ধারণ হয়। তবে নিজস্ব অর্থনীতি দুর্বল অথবা ভঙ্গুর অবস্থায় থাকলে এর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা কঠিন হয়ে পড়বে এবং দেশের অভ্যন্তরে নানা অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে। বতর্মান বাস্তবতায় বারবার সামনে চলে আসছে দেশের ব্যাংকগুলোতে বিদ্যমান অর্থ সংকট। কয়েক মাস ধরে কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের অব্যবস্থাপনা, অর্থ সংকট, অর্থ পাচার ও লুটপাটের বিভিন্ন চিত্র প্রকাশ হওয়ার পর জনমনে দেশের অর্থনীতি নিয়ে নানা শঙ্কা কাজ করছে।

ব্যাংকগুলোতে টাকা না থাকার কারণে আমানতকারীরা টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। নতুন ঋণ দেওয়াও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা পড়ে গেছেন মহাসংকটে। অনেক ক্ষেত্রে দেওয়া ঋণও ফেরত নিচ্ছে কয়েকটি ব্যাংক। এ অবস্থায় দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য মুখ থুবড়ে পড়ার মতো অবস্থা দেখছেন বিশ্লেষকরা।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে চলছে চরম মূলধন সংকট। এ ঘাটতি মেটাতে এরই মধ্যে সরকারের কাছ থেকে ২ হাজার কোটি টাকা চেয়েছে ৬টি ব্যাংক। অপরদিকে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে চলছে তারল্য সংকট। অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংকই এখন ধারদেনা করে চলছে। এরই মধ্যে সংকটে পড়া ব্যাংকগুলোকে অর্ধশত কোটি টাকা ধার দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। এমন অবস্থায় আমানত সংগ্রহে মরিয়া বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তারা বেশি সুদের প্রস্তাব দিয়ে আমানত সংগ্রহের চেষ্টা করছেন টাকাওয়ালাদের। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া সুদের হার বেড়ে চলেছে। একইসঙ্গে ঋণগ্রহীতাদেরও গুনতে হচ্ছে বেশি সুদ। ব্যাংকগুলোর এমন শোচনীয় অবস্থা যে, বাড়তি সুদেও ব্যবসায়ীদের টাকা দিতে পারছে না অনেক ব্যাংক। ব্যাংকগুলোর এ দৈনদশার কারণে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে নেমে এসেছে হতাশার ছাপ।

বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, তারল্য সংকটের কারণে মাস দু-এক আগেও ব্যাংকগুলো বড় গ্রাহকদের ৮-৯ শতাংশ সুদে ঋণ দিত। যা এখন ২-৩ শতাংশ বেশি দিতে হচ্ছে। একইভাবে বেড়ে গেছে ভোক্তা ও গৃহঋণের সুদের হারও।

বিশ্লেষকরা হঠাৎ করে ব্যাংকের এই টাকার সংকটের পেছনে কয়েকটি কারণ খুঁজে বের করেছেন, তার মধ্যে প্রধানতম কারণ হলো- ব্যাংকের আমানতের বিপরীতে ঋণ বিতরণের সীমা অতিক্রম করা।

সুদের হার কম হওয়ায় ব্যাংকে আমানত কমে যাওয়া এবং সুদ কম পাওয়ায় আমানতকারীরা ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেওয়ার কারণেও ব্যাংকগুলো অর্থ সংকটে পড়েছে। এছাড়া ডলার বিক্রি করে ব্যাংক থেকে আমানতকারীদের অর্থ তুলে নেওয়া, ভুয়া কাগজপত্রে প্রভাবশালীদের ঋণ দেওয়া এবং সে টাকা বিদেশে পাচার হওয়া, ঋণ বিতরণের নামে অবৈধ পন্থায় ব্যাংক থেকে টাকা লুট ও মালিক পক্ষের নৈতিক স্খলন, আশঙ্কাজনকভাবে রেমিটেন্স কমে যাওয়াসহ বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ব্যাংকের টাকা লুটপাট, রিজার্ভ চুরি, বিশেষ গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে দেশের অনেকগুলো ব্যাংকের মালিকানা চলে যাওয়ার কারণেও ব্যাংকিং খাতে এ ধরনের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় ব্যাংকের সঙ্গে আমানতকারী, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের আশঙ্কা করছেন অনেকে।
বাংলাদেশ যখন উন্নয়নশীল দেশের যোগ্যতা অর্জন করে একটা নতুন যাত্রা শুরু করেছে সেই সময়ে এ ধরনের অর্থনৈতিক সংকট আসন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নতুন কোনো প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করবে কি না এ নিয়ে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন মত।