চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিত্যনৈমিত্তিক হয়রানি ও অনিয়ম।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিত্যনৈমিত্তিক হয়রানি ও অনিয়ম।

122
SHARE

নিজস্ব প্রতিনিধি : সুমন ভট্টাচার্য: চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের বেশীর ভাগ ওয়ার্ডে নার্স, ওয়ার্ডবয় ও দারোয়ানদের দৌরাত্ম্যে জিম্মি হয়ে পড়েছেন সাধারণ রোগী ও তাদের স্বজনরা। সরকারী এ হাসপাতালে নিন্ম ও মধ্যম আয়ের পরিবারের সেবা নেওয়ার অন্যতম ঠিকানা।টাকা (বখশিস) ছাড়া কোনো সেবাই মিলে না প্রায় ওয়ার্ডে। টিকেট নিয়ে গুরুতর রোগী ভর্তির পর শুরু হয় আয়া, বুয়া ও দারোয়ানদের দৌরাত্ম্য। রোগীদের নির্ধারিত ওয়ার্ডে নিয়ে যাওয়ার জন্য ট্রলি চাইলে দিতে হয় টাকা।

পারভীন নামের এক রোগীর অভিভাবক শিক্ষক মোঃ আলমগীর জানান, টিকেট কাউন্টারে জনি নামের একজন ১৫ টাকার জায়গায় ৫০ টাকা নিয়েছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, হাসপাতালের ২৫ নম্বর ওয়ার্ডে পিত্ততলীর রোগে আক্রান্ত হয়ে ৪৯ নং বেডে পড়ে আছেন রোখসানা আকতার (২০)। সীতাকুন্ড থেকে আসা এই রোগী নিজেই একজন বেসরকারী হাসপাতালের সেবিকা। ভর্তি করানোর পর রোগীর রক্ত ও ইউরিন পরীক্ষা করতে বলা হয়। যার মধ্যে ছিল সিবিসি, ইউরিন আরই, এসজিপিটি, বিলোরোবিন এর জন্য হাসপাতাল কতৃপক্ষ ৫৮০ টাকা নেন। এই টাকায় প্রাইভেট ডায়াগনষ্টিকে করা যেত বলে তার অভিমত। সিট হস্তান্তরের জন্য নেন ১০০ টাকা । রোগীর অভিভাবক আমেনা আক্তার বলেন, আমার মেয়ের বাবা নাই। আর্থিক অসচ্চলতার জন্য সরকারী হাসপাতালে আসি। কিন্তু টাকা ছাড়া কোন সেবা তারা পাননি ।

২৫ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন বাঁশখালীর খানখানাবাদের, মৌলভী পাড়া থেকে আসা রোগীর অভিভাবক জসিম উদ্দীন বলেন, আমার বোন পারভীন আক্তারকে অপারেশনের জন্য হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। টিকেট কাউন্টারে আমার থেকে ১৫ টাকার জায়গায় ৪০ টাকা নেন।
গেইটে দায়িত্বরত দারোয়ানকে প্রতিবারই ওয়ার্ডে ভিতর ঢুকতে হলে ৫০ টাকা দিতে হয়। টাকা না দিলে ওয়ার্ডে ঢুকতে দেয়না। হাসপাতালের আয়া বুয়ারাই করে নার্সের কাজ।

২৪ নং ওয়ার্ডে ভর্তি হ্ওয়া অমল মিত্রের অভিভাবক অনাথ বন্ধু বলেন, টাকা না দেয়ায় দারোয়ান ভিতরে ঢুকতে দিচ্ছেনা। ডাক্তারের সঙ্গে কথাও বলতে পারছিনা। নার্সরা এসে দেখে চলে গেছেন। গেইটে দায়িত্বরত দারোয়ানকে প্রতিবারই ওয়ার্ডে ঢুকতে হলে টাকা দিতে হয়।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, হাসপাতালের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের গেইটে দায়িত্বরত প্রকাশ পাল নামের এক দারোয়া্ন প্রতিটি রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে প্রতিজন কমপক্ষে ২০ টাকা করে নিতে ।টাকা না দিলে ওয়ার্ডের ভিতর রোগীর স্বজনদের প্রবেশ করতে দেয়না।

তারেক আজিজ এরফান নামের রাউজান থেকে আসা এক রোগীর আত্মীয় জানান, তার বন্ধুকে মেডিসিন বিভাগের ওয়ার্ডে ভর্তি করানো হয়। চারদিন রাখার পর তারা হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা শেষ না করে বাসায় ফিরে যাচ্ছেন।

নীচ তলায় অবস্থিত মানসিক ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায় আরো ভূতুড়ে পরিবেশ। মানসিক রোগীরা যে যার মতো করে ঘুরছেন ফিরছেন আবার একে অপরের সঙ্গে ধস্তাধস্তিও করছেন। তাদেরকে দেখাশুনা করার জন্য রোগীর অভিভাবকরা ছাড়া কোনো নার্স চোখে পড়েনি।

প্যাথলজিতে পরীক্ষা করাতে আসা স্বপ্না কিউ২৪নিউজডট কমকে জানান, সকাল থেকে বসে আছি কিন্তু এখনো (বেলা ২টা) কোন সিরায়াল পাননি।

ভবনের পাশের বিরাট ডাস্টবিন থেকে দুর্গন্ধ আসছে। যেখানে হাসপাতালের রোগীদের বিভিন্ন ময়লা-আবর্জনা ফেলা হয়েছে।নিয়মিত পরিস্কার না করার ফলে ডাস্টবিনটি থেকে উৎকট গন্ধ বের হচ্ছে।

এসব বিষয়ে চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জালাল উদ্দীনের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি কিউ২৪নিউজকে জানান, এ ঘটনা খুবই দুঃখজনক।

আমাদের রোগী ও দর্শনার্থী এ ব্যাপারে আমাদের সহযোগিতা নিতে পারে, আমরা পাসকার্ডের ব্যবস্হা করেছি।এই পক্রিয়া মেনে চললে কারো কাছ থেকে র্কমচারীরা টাকা নেওয়ার অভিযোগ আসত না। তবুও সুর্নিদিষ্ট অভিযোগ পাইলে আমরা তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা নিয়েছি। আমরা সবসময় সজাগ ও তৎপর যাতে রোগিরা তাদের ন্যায্য অধিকার স্বাস্থ্য সেবা পায়। কিছু অসাধু কর্মচারী সুযোগ বুঝে অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ে। আমরা কিছুদিন আগে একই অভিযোগের ভিত্তিতে কয়েকজনকে চাকুরীচ্যুত করি।
তবে তিনি আশ্বাস দিলেন, ভবিষ্যতে এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

রোগীদের স্থান সংকুলান নিয়ে প্রশ্ন করা হলে, তিনি জানান, বর্তমানে ৫শ বেডের ধারন ক্ষমতা সম্পন্ন আমাদের হাসপাতাল। তার মধ্যে আমরা প্রতিনিয়ত প্রায় ৩হাজার রোগীকে স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে যাচ্ছি। পর্যাপ্ত বেড না থাকায় রোগীদের অনেক সময় বাধ্য হয়ে করিডোরে স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে যাচ্ছি।

তিনি আরো জানান শীঘ্রই শিশুদের জন্য ৬৫০ বেডের শিশু হাসপাতালের জন্য জায়গা দেখা হচ্ছে।
কার্ডিয়াক সার্জারীর ১০ তলার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে । অন্যদিকে ৫০০ বেডের ট্রমাসেন্টার গড়তে যাচ্ছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এগুলোর কাজ শেষ হলে হাসপাতালে রোগীর চাপ কমবে এবং স্বাস্থ্য সেবার মান আরো বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে ৬ তলা বিশিষ্ট হাসপাতাল বিল্ডিংকে উর্ধ্বমুখী ৪ তলা বর্ধিত করে ১০ তলায় উন্নীত করে ১হাজার বেড বর্ধিত করা হবে।