বেদখলে বিবর্ণ এক শহর।

বেদখলে বিবর্ণ এক শহর।

61
SHARE
নিজস্ব প্রতিনিধি : হাবিবুর রহমান (সুজন):

বছর দশেক আগেও হ্রদ-পাহাড়ের শহর রাঙামাটি বেড়াতে এসে যেকোনো পর্যটক অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হতেন। আর এখন সবুজ পাহাড় কিংবা স্বপ্নিল হ্রদ দেখতে আসা আগন্তুক হতাশ হন বিবর্ণ রাঙামাটি দেখে। দখলবাজরা কেড়ে নিয়েছে রাঙামাটি শহরের সেই মুগ্ধতা। অপরূপা রাঙামাটিকে দিয়েছে বস্তির শহরের ‘খ্যাতি’। সরকারি কিংবা খাসজমি, হোক কোনো প্রতিষ্ঠানের জমি, দখলবাজদের ‘কালো চোখ’ থেকে রক্ষা পায়নি কিছুই। শহরের শ্মশান, বাস টার্মিনাল, কলেজের জমিসহ বেদখল হয়ে গেছে যেন পুরো শহরই। এ নিয়ে নানা সময় আইনশৃঙ্খলা সভায় আলোচনা হয়, কেউ কেউ অভিযোগ করেন, প্রশাসনও তাদের আশ্বস্থ করে, কখনো কখনো চলে উচ্ছেদ অভিযানও। তারপর সবই চলে আগের মতো। রাঙামাটি শহরের মানিকছড়ি থেকে শুরু করে ডিসি বাংলো পর্যন্ত সড়কের পাশে কোথাও একটু জায়গা নেই যেখানে মানুষ হাঁটাচলা করতে পারে। শহরবাসীর প্রিয় ফিশারি সংযোগ সড়কেও বিষফোঁড়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে দুটি অবৈধ স্থাপনা।

একসময় শহরের সবচেয়ে বড় খোলামেলা জায়গা হিসেবে পরিচিত ছিল চিতাখোলা। যেখানে করা হতো হিন্দুদের শবদাহ। কিন্তু মাত্র ১০ বছরের ব্যবধানেই পাল্টে গেছে সেখানকার মানচিত্র। শ্মশান উধাও হয়ে সেখানে এখন বিশাল বসতি, যার নামকরণ হয়েছে ‘শান্তিনগর’! একই স্থানে হওয়া শহরের নতুন বাস টার্মিনালটি নিজেই যেমন দখল করা জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তেমনি টার্মিনালের জায়গাও বেদখলে হাতছাড়া এখন। দখলবাজদের দাপটে ছোট হতে হতে টার্মিনাল নিজেই এখন অস্তিত্ব সংকটে।

শহরের এসপি অফিসের সামনের রাঙামাটি সরকারি মহিলা কলেজের সড়কটিও দখলবাজদের কুনজর থেকে মুক্তি পায়নি। দখল করতে করতে দখলবাজরা এই সড়কটিকে এতটাই সংকুচিত করে ফেলেছে যে কোনো কোনো বাড়ির থুথু কিংবা নোংরা পানি কলেজছাত্রীদের শরীরে পড়া নিত্যদিনের ঘটনা।
শহরের পুলিশ লাইন ও ডিসি বাংলো এলাকাটি এক দশক আগেও সবচেয়ে নির্জন এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু মাত্র এক দশকেই সেখানে একশতক খালি জায়গা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। হাজার হাজার বসতি সেখানে। যার বেশির ভাগই খোদ পুলিশ, রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জনের মালিকানায় কিংবা সরকারি খাস জায়গা!

আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিত তবলছড়ি এলাকায় বেশির ভাগ সরকারি কোয়ার্টার সংলগ্ন খালি জায়গা দখল করে নিজেদের বসতি বানিয়েছেন ওই কোয়ার্টারে থাকা স্টাফরাই। সেখানে একটি কোয়ার্টারও পাওয়া যাবে না, যেখানে কোনো খালি জায়গা আছে। ওই এলাকার ওয়াপদা কলোনির বিএডিসি পার্ক এখন দখলবাজদের বস্তি, আসামবস্তি-তবলছড়ি সংযোগ বাঁধও বেদখলের ঝুঁকিতে। পর্যটন কমপ্লেক্সে সীমানার বাইরের এলাকাগুলোও দখল হয়ে গেছে অনেক আগেই।

রাঙামাটি শহরের প্রবেশপথেই রেডিও ও টেলিভিশন সেন্টারের চারপাশের সব জায়গা দখল করে নিজেদের মতো নাম দিয়ে নতুন নতুন এলাকা প্রতিষ্ঠা করছে দখলবাজরা। যেন বাপের তালুক পুরো শহর।

পুরো শহরের সব স্থানেই দখলবাজদের কর্তৃত্ব। ঘনবসিতপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত বনরূপা, রিজার্ভবাজার কিংবা তবলছড়ি বাজারেও এখন দখলবাজদের পোয়াবারো। হ্রদের ওপর পিলার বা খুঁটি গেড়ে প্রতিনিয়তই তৈরি হচ্ছে স্থাপনা।

বিপন্ন কাপ্তাই হ্রদ : রাঙামাটিতে অবৈধ দখলের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অপরূপা কাপ্তাই হ্রদ। রাঙামাটি শহরের তিনদিকে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা এই হ্রদ দখল করতে করতে এর অস্তিত্বই গিলতে চাইছে দখলবাজরা। শহরের রিজার্ভবাজার, বনরূপা, গর্জনতলি, তবলছড়ি, পুলিশ লাইন, পুরাতন বাসস্টেশন এলাকাসহ চারপাশেই হ্রদের ওপর স্থাপনা চোখে পড়ে। হ্রদের ওপর স্থাপনা নির্মাণ ছাড়াও এসব স্থাপনার পয়োনিষ্কাশন লাইনও সরাসরি দেওয়া হয় হ্রদের জলে। ফলে শহরবাসীর খাবার ও ব্যবহার্য পানির প্রধান উৎসটি ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিপন্ন হচ্ছে কাপ্তাইয়ের স্বাদের মাছ। হ্রদের পানিতে বাড়ছে কলিফর্মসহ বিভিন্ন ক্ষতিকারক জীবাণুর উপস্থিতি।

দখলবাজদের শহর : রাঙামাটি শহরে যাঁরা বাড়িঘর নির্মাণ করে বাস করছেন তাঁদের একটি বড় অংশই অবৈধ দখলদার! কি পাহাড়ি কি বাঙালি। আগে অরণ্যচারী পাহাড়িরা বনের কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করলেও এখন জীবনের প্রয়োজনেই শহরমুখী। শহরমুখিতার কারণে বাড়ছে খাস জমি, হ্রদবর্তী জমি বেদখল করে বাড়ি নির্মাণের প্রবণতাও। আর বাঙালি জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ভাসমান হয়ে কিংবা জীবনের প্রয়োজনে রাঙামাটি এসে বসবাস শুরু করে। তারা শহরের বিভিন্ন সরকারি খাস জায়গা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন জায়গা দখল করে বাড়ি নির্মাণ করে বাস করছে। বহিরাগতদের দাপটে শহরে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করা রাঙামাটিবাসীও এখন বিপাকে। আর এই দখলবাজরা ক্রমেই প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মূল নেতৃত্বে চলে আসায় রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাও বেড়েছে দখলবাজদের দিকে।

আশার আলো : পার্বত্য রাজনীতির নানা মেরুকরণের কারণে স্থানীয় প্রশাসনে দায়িত্বপালনকারীরা কখনোই অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে আগ্রহী নন। হলেও সেই আগ্রহে ভাটা পড়ে দ্রুতই। কিন্তু রাঙামাটির সাবেক জেলা প্রশাসক মো. মোস্তফা কামাল তার দায়িত্বকালিন দুই বছরে বেশ কিছু অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছেন। আর তার এই কাজে সহযোগী হিসেবে সহযোগিতা দিয়েছেন রাঙামাটি পৌরসভার মেয়র সাইফুল ইসলাম ভুট্টো। রাঙামাটি পার্ককে অবৈধ দখলদারমুক্ত করা, শহরের ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা, স্পর্শকাতর ফরেস্ট রোড ও বনরূপা বাজার দখলমুক্ত করা, শহরের বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন তিনি, যা এখনো চলমান। তবে এই কাজ করতে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নানা দিক থেকে চাপে পড়তে হয়েছে তাঁকেও।