ফোরজি যুগের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ।

ফোরজি যুগের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ।

44
SHARE
নিজস্ব প্রতিনিধি : হাবিবুর রহমান (সুজন): ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার ২৪ জানুয়ারি জাতীয় সংসদকে জানিয়েছেন, আগামী মে মাসে টেলিটক চতুর্থ প্রজন্মের (ফোরজি) সেবা চালু করবে। তিনি বলেছেন, টেলিটক নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় ২শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে সকল বিভাগীয় শহরে ফোরজি সেবা চালু করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। তিনি আরও জানান, গ্রাহক সংখ্যা বৃদ্ধিতে টেলিটকের নেটওয়ার্ক পরিধি বৃদ্ধির লক্ষ্যে ইতিমধ্যে ২টি প্রকল্প চলমান রয়েছে। এ দু’টি প্রকল্প সমাপ্ত হলে উপজেলা পর্যায়ে নিরবচ্ছিন্ন তৃতীয় প্রজন্মের (থ্রিজি) নেটওয়ার্ক কভারেজ দেয়া সম্ভব হবে।

তবে এই মুহূর্তে টেক পাগল প্রজন্ম হিসেব-নিকেশ করে বুঝতে চাইছে, ফোরজির গতি কেমন হবে? জানা গেছে, সরকারি টেলিকম কোম্পানি টেলিটকের পাশাপাশি মোবাইল অপারেটগুলিও ফোরজি নেটওয়ার্ক স্থাপনের প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। টেলিটকের পর পরই বাকি অপারেটরদের ফোরজি সেবা পাওয়া যাবে।

উল্লেখ্য, ফোরজি হল চতুর্থ প্রজন্মের ব্রডব্যান্ড সেলুলার নেটওয়ার্ক টেকনোলজি। ইন্টারন্যাশনাল টেলিকম্যুনিকেশন ইউনিয়ন-রেডিও কম্যুনিকেশনস সেক্টর (আইটিইউ-আর) কর্তৃক নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী ফোরজি সার্ভিসে হাই মোবিলিটি কম্যুনিকেশন (ট্রেনে বা গাড়িতে চলার সময়) ও লো মোবিলিটি কম্যুনিকেশনসের (স্থির অবস্থা বা হাঁটাচলার সময়) জন্য ইন্টারনেটের গতি হতে হবে যথাক্রমে সেকেন্ডে ১০০ মেগাবিট ও ১ গিগাবিট।

সাধারণভাবে ধরা হয় ফোরজি নেটওয়ার্কে ইন্টারনেটের গতি থ্রিজি নেটওয়ার্কের তুলনায় ১০ গুণ বেশি। তবে ফোর-জির নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। বর্তমানে বিটিআরসি কর্তৃক নির্ধারিত ফোর-জির গতি সেকেন্ডে ২০ মেগাবিট।

বলা হচ্ছে, নেটওয়ার্ক প্রযুক্তির বিবর্তনের একটি ধাপ হল ফোরজি। ১৯৮০ ও ৯০ এর দশকে ব্যবহৃত ওয়ানজি ও টুজি মূলত ভয়েস ও সাধারণ ডিজিটাল ডেটা ট্রান্সমিশনে সক্ষম ছিল। পরবর্তীতে উচ্চ গতির ইন্টারনেট সেবা প্রদানে সক্ষম থ্রি-জি ও ফোর-জি নেটওয়ার্কের যাত্রা শুরু হয় যথাক্রমে ১৯৯৮ ও ২০০৮ সালে।

টেক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফোর-জি প্রযুক্তিকে সঠিকভাবে প্রয়োগ করা গেলে তা দেশের তথ্যপ্রযুক্তিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে। ফোরজির প্রধান বৈশিষ্ট্য হল দ্রুতগতির ইন্টারনেট। ফলে এটি চালু হলে ইন্টারনেটভিত্তিক বিভিন্ন সার্ভিস ব্যবহার করা যাবে অত্যন্ত সহজে। সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’বাস্তবায়নে ফোর-জি হতে পারে অন্যতম প্রধান সহায়ক।

তারা বলেন, ফ্রিল্যান্সিংসহ অন্যান্য ইন্টারনেটভিত্তিক পেশার সাথে জড়িতদের জন্যও ফোর-জি হতে পারে অত্যন্ত উপযোগী। অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইন্সটিটিউটের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, ফ্রিল্যান্সারের সংখ্যার দিয়ে সমগ্র বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। এই সমীক্ষাই প্রমাণ করে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দ্রুত গতির ইন্টারনেট কতো বড় ভূমিকা রাখতে পারে। দেশের প্রতিটি প্রান্তে ফোরজি পৌঁছে গেলে আরও বেশি সংখ্যক মানুষ ফ্রিল্যান্সিংকে পেশা হিসেবে নেওয়ার সুযোগ পাবে।

এটা ঠিক যে, দেশে ক্রমশ মোবাইল ইন্টারনেটের ব্যবহারও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিটিআরসির ওয়েবসাইটের তথ্য মতে, গত বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ৬৩.১২ মিলিয়ন। দেশের যেসব স্থানে ব্রডব্যান্ড সার্ভিস পৌঁছায়নি সেসব স্থানে ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রধান মাধ্যম এখনও মোবাইল। তাই স্বাভাবিকভাবেই ফোর-জি দেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারী সংখ্যা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

তবে ফোরজির বাস্তবায়ন আগামীতে কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তির এই নেটওয়ার্ক স্থাপন অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ একটি প্রক্রিয়া। ফোরজি চালু হয়েছে এমন দেশগুলির সব স্থানকেও এখনো এর আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। মূলত শহর ও জনবহুল অঞ্চলেই ফোর-জি সেবা চালু করা হয়ে থাকে। তাছাড়া এই মুহূর্তে বাংলাদেশে ফোর-জি উপযোগী মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা অপ্রতুল। দেশের স্মার্টফোন ব্যবকারীদের মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশ ফোরজি উপযোগী স্মার্টফোন ব্যবহার করে থাকেন।

তবে ফোর-জির বাস্তবায়নে কিছু সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ থাকলেও সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ উদ্যোগের মাধ্যমে সেগুলি মোকাবেলা করা সম্ভব। বিশ্বের বহু দেশের মতো বাংলাদেশের তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়নেও ফোর-জি ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।

বাংলাদেশে ফোরজি ইন্টারনেট চালু হলে সেটি সর্বোচ্চ কত স্পিডের হবে সেটি জানতে হবে অপেক্ষা করতে হবে অনেক দিন। তবে ইন্টারনেট দুনিয়ার দ্রুতগতির ফোরজি ইন্টারনেট সেবা কেমন সেটা দেখা যাক। এখানে বিশ্বের দ্রুতগতির ফোরজি ইন্টারনেট সম্পন্ন ৬টি দেশের উল্লেখ করা হলো:

ব্রিটেন: দ্রুতগতির ফোরজি ইন্টারনেট সেবাদানে বিশ্বের শীর্ষস্থানে রয়েছে যুক্তরাজ্যের টেলিকম অপারেটর ইই। দেশটির বিভিন্ন শহরে এই টেলিকম অপারেটরটি সর্বোচ্চ ৬০ মেগাবাইট পার সেকেন্ডে ইন্টারনেট সেবা দেয়। যেখানে গড় ইন্টারনেট স্পিড ২৫ থেকে ৩০ মেগাবাইট পার সেকেন্ড।

যুক্তরাষ্ট্র: দ্রুতগতির ফোরজি ইন্টারনেট সেবাদানে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এটিঅ্যান্ডটি। পিসিম্যাগের তথ্যানুযায়ী, এই টেলিকম অপারেটরটির গড় স্পিড ৫৮.২৫ মেগাবাইট পার সেকেন্ড।

দক্ষিণ কোরিয়া: তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার এসকে টেলিকম। প্রতিষ্ঠানটির গড় ফোরজি ইন্টারনেট স্পিড ৫৩.৫ মেগাবাইট পার সেকেন্ড।

অস্ট্রেলিয়া: মোট জনসংখ্যার ২১ শতাংশকে ফোরজি ইন্টারনেট সেবাদানকারী অস্ট্রেলিয়ার প্রধান টেলিকম অপারেটর অপটাস এবং টেলেস্ট্রার গড় ইন্টারনেট স্পিড যথাক্রমে ৪৫ ও ৫০ মেগাবাইট পার সেকেন্ড। সিনেট অস্ট্রেলিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই দুটির অপারেটর মিলে দেশটির গড় ইন্টারনেট স্পিড ৬০ মেগাবাইট পার সেকেন্ডেরও বেশি।

কানাডা: কানাডার টেলিকম অপারেটর রোজর্সের গড় ফোরজি ইন্টারনেট স্পিড ১৭ মেগাবাইট পার সেকেন্ড। যদিও প্রতিষ্ঠানটির দাবি তারা স্বাভাবিকভাবে ৪০ মেগাবাইট পার সেকেন্ডে ইন্টারনেট সেবা দেয়।

ভারত: ভারতের টেলিকম অপারেটর রিলায়েন্স জিয়ো ইনফোকম জানিয়েছে, তারা শিগগিরই যে ফোরজি ইন্টারনেট সেবা চালু করতে যাচ্ছে তার গড় গতি হবে ৪৯ মেগাবাইট পার সেকেন্ড। অবশ্য ভারতী এয়ারটেল আগেই ৪০ মেগাবাইট পার সেকেন্ডের ফোরজি ডাউনলোড স্পিড দিচ্ছে। তবে এটি শুধুমাত্র মডেমের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। স্মার্টফোন ও ট্যাবলেটে এই সেবা পাওয়া যায় না।