শুধু ভবন নড়েবড়ে তা নয়, এখানে পাঠদান করার পরিবেশও নেই।

শুধু ভবন নড়েবড়ে তা নয়, এখানে পাঠদান করার পরিবেশও নেই।

54
SHARE
 নিজস্ব প্রতিনিধি : হাবিবুর রহমান (সুজন):  খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি থেকে ফিরে,

 মানিকছড়ির দুর্গম জনপদ দক্ষিণ হাফছড়ির‘শিশু শিক্ষা কেন্দ্রে’প্রতিকূল পরিবেশে পাঠদান চলছে! শিক্ষা কেন্দ্রের পুরনো জরাজীর্ণ টিনসেড ভবনের ইট ও প্লাস্টার খসে খসে পড়ছে। তবুও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে শিক্ষার্থীরা পাঠদান করতে বাধ্য হচ্ছে। কারণ এ গ্রামের ৩/৪ কিলোমিটার লোকালয়ে আর কোন প্রতিষ্ঠান নেই! শুধু ভবন নড়েবড়ে তা নয়, এখানে পাঠদান করার পরিবেশও নেই। বিদ্যুৎ নেই, বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা নেই, পয়ঃনিষ্কাশনের সুবিধা নেই। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির ফোটা অনায়াসে ঘরে ঢুকছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মানিকছড়ি সদর ইউনিয়নের দক্ষিণ হাফছড়ি গ্রামে বর্তমানে জনবসতি কম। ১৯৮৮সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিরাজমান পরিস্থিতে বাঙালিদেরকে গুচ্ছগ্রামে নিয়ে আসার কারণে বিশাল জনপদে এখন কেবল মারমা জনগোষ্ঠী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসবাস করছে। অবহেলিত এ জনপদে উন্নয়নের ছোয়া নেই বললেই চলে। রাস্তা, কালর্ভাট নেই, সরকারি, আধা-সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ক্যায়াং ঘরে উন্নয়নের নমুনা নেই। এমন পরিস্থিতিতে ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছরে উপজেলা স্থানীয় সরকারের অর্থায়নে একটি টিন সেড ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে কমিউনিটি গ্রামীণ স্কুল নামে পাঠদান পরিচালিত হয়ে আসছে। কমিউনিটি স্কুলটি স্থাপিত হওয়ার পর এলাকাবাসীর ধারণা ছিল উক্ত জনপদের ৬ টি গ্রামের দেড়-দু’শতাধিক কোমলমতি শিশুদের লেখাপড়া শেখার অন্তত একটি সুযোগ হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন, অবৈতিকভাবে দূর থেকে এসে কয়েকজন শিক্ষক বছরখানেক থেমে থেমে পাঠদান চালালেও স্থানীয় যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক শিক্ষিকা না থাকায় স্থায়ীভাবে শিক্ষা কার্যক্রম এক সময় বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন গ্রামীণ স্কুলটি বন্ধ থাকার পর পুনরায় ২০০৭ সালে এলাকাবাসী, অভিভাবকরা নিজেদের অনুদানে শিক্ষকদের বেতন ও প্রশাসনিক খরচ নির্বাহ করে ২০০৯ সাল পর্যন্ত বিদ্যালয়টিতে নিয়মিত পাঠদান চালু রাখেন। পরবর্তীতে অনুদানের সংকটে পড়ে এবং ম্যানেজিং কমিটির দ্বন্দ্বের কারণে তা আবার বন্ধ হয়ে যায়! ৩ বছর এ জনপদ শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ছিল! পরে ২০১২ সালে কারিতাস আলোঘর (লাইট হাউজ) প্রকল্প উক্ত স্কুলটিকে দক্ষিণ হাফছড়ি পাড়া শিশু শিক্ষা কেন্দ্র নামে পরিচালনা শুরু করে। বর্তমানে এই শিশু শিক্ষাকেন্দ্রে ইসিই থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ১২০শিক্ষার্থী নিয়ে ২ জন নিয়মিত ও ২ জন খন্ডকালীন শিক্ষক পাঠদান চালাচ্ছে। এ শিশু শিক্ষাকেন্দ্রটিতে ৩টি শ্রেণিকক্ষ, ১টি অফিস কক্ষ রয়েছে। নিয়মিত দুইজন শিক্ষকের বেতন, শিক্ষার্থীদের বই-খাতা কাগজ-কলমসহ যাবতীয় শিক্ষা উপকরণ ও টেকনিক্যাল সহায়তা এবং শিক্ষাঅফিসের সাথে সমন্বয় সাধনের কাজটিও নিয়মিতভাবে‘কারিতাস আলোঘর’প্রকল্প থেকে প্রদান করা হয়।

খন্ডকালীন শিক্ষিকা মানু মারমা কিউ২৪ নিউজ ডটকম কে বলেন, দুইজন নিয়মিত শিক্ষক দিয়ে ৭টি শ্রেণি কক্ষে পাঠদান কষ্টকর। তাই শিক্ষাকেন্দ্রের পরিচালনা কমিটিদের অনুরোধে বিনা বেতনে নিয়মিত পাঠদান দিয়ে আসছি। তিনি আরো বলেন, সকল ক্রাইটেরিয়া পূরণ থাকলেও প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সু-দৃষ্টির অভাবে শিক্ষাকেন্দ্রটি বারবার জাতীয়করণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পরিচালনা কমিটির সভাপতি যোগেশ চন্দ্র চাকমা অভিযোগ করে  কিউ২৪ নিউজ ডটকম কে বলেন, উক্ত শিক্ষা কেন্দ্রে ও তার আশপাশে সুপেয় পানিয় ব্যবস্থা না থাকায়, কুয়ার পানি পান করে শিক্ষার্থীরা পানিবাহিত রোগে ভুগছে। জরুরি ভিত্তিতে শিক্ষাকেন্দ্রটি পূর্ণ সংস্কার করা না হলে যে কোন মুহূর্তে পাঠদান বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। তিনি আরো বলেন, উপজেলার গচ্ছাবিল, হ্লাপাইদং, দক্ষিণ হাফছড়ি গ্রামে একই সময়ে ৩টি গ্রামীণ স্কুল স্থাপন হলেও শুধুমাত্র গচ্ছাবিল স্কুলটি জাতীয়করণ হয়েছে। কিন্তু দক্ষিণ হাফছড়ি ও হ্লাপাইদং কমিউনিটির স্কুলটি জাতীয়করণ হয়নি!

গ্রাম প্রধান (পাড়া কার্বারি) রা¤্রাচাই মারমা কিউ২৪ নিউজ ডটকম কে  বলেন, দক্ষিণ হাফছড়ি পাড়া ‘শিশু শিক্ষাকেন্দ্রটির নিভু নিভু অবস্থা! দ্রুত এ জনপদেও একমাত্র বিদ্যাপীঠ জাতীয়কণসহ ভবন নির্মাণ, বিশুদ্ধ পানীয় জল, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য আমরা জোরদাবী জানাচ্ছি।

মানিকছড়ি উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা শুভাাশীষ বড়ুয়া কিউ২৪ নিউজ ডটকম কে বলেন, দক্ষিণ হাফছড়ির নির্জন পল্লীতে কারিতাস আলোঘর প্রকল্প শিক্ষাকেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে। আগামী মাসে এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। অথচ এ জনপদেও ৬ কিলোমিটার আশে-পাশে কোন বিদ্যালয় নেই। তাই কোমলমতি শিশুদের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে বিদ্যালয়টি চালু রাখা প্রয়োজন।

উপজেলা চেয়ারম্যান মাগ্য মারমা কিউ২৪ নিউজ ডটকম কে  বলেন, অফিসিয়াল যোগাযোগের অভাবে শিক্ষাকেন্দ্রটি জাতীয়করণের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। যেহেতু বিষয়টি এখন আমার নজরে এসেছে তাই আমি উপজেলা নিবার্হী অফিসার ও শিক্ষা অফিসার সাথে আলোচনাক্রমে দ্রুত সময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো তাই দক্ষিণ হাফছড়ি শিশু কেন্দ্রটির যদি একটি বিহিত ব্যবস্থা করা না হয় তাহলে পুনরায় শিক্ষাকেন্দ্রটি বন্ধ হলে এখানকার শতশত কোমলমতি শিশুরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে।