পাঁচ বছরে দশগুণ বেড়েছে ঔষধের দাম,বিপাকে রোগীরা।

পাঁচ বছরে দশগুণ বেড়েছে ঔষধের দাম,বিপাকে রোগীরা।

49
SHARE

নিজস্ব প্রতিনিধি : মোঃ   হাবিবুর রহমান (সুজন):      গত ৫ বছরে দশগুণ বেড়েছে ওষুধের দাম। গত ১১ মাসে ৪ দফায় দ্বিগুণেরও বেশি দাম বেড়েছে। এরমধ্যে রয়েছে বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিক, ডায়াবেটিস, গ্যাস্ট্রিক ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগসহ দুরারোগ্য ব্যাধির নানা ওষুধ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চলতি বছর জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত এক হাজার ৪০০ রকমের ওষুধের দাম ৪০-৫০ শতাংশ বেড়েছে। এপ্রিল থেকে মে পর্যন্ত বেড়েছে ২০-৩০ শতাংশ। জুন ও জুলাই মাসে বেড়েছে তৃতীয় দফা।সর্বশেষ চলতি নভেম্বর মাসে ওষুধের দাম আরও এক দফা বাড়ানোয় তা ১০০ শতাংশে পৌছে। এর আগে ২০১২ সালের শেষের দিকে হঠাৎ ওষুধের দাম বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হয়। সেখান থেকে প্রতিবছর দ্বিগুণ হারে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে ওষুধের দাম। এতে বিপাকে পড়ছেন জটিল রোগে আক্রান্তরা। এদেরমধ্যে যারা দিনে আনে দিনে খায় তাদের যেন মরণদশা।

নগরীর হালিশহর কে-ব্লকের বাসিন্দা আশিকুর রহমান  Q24news কে জানান, ডায়াবেটিস ও শ্বাসকষ্ট রোগে প্রতিমাসে তাকে এক হাজার থেকে ১২০০ টাকার ওষুধ কিনতে হয়। ওষুধের দাম বাড়তে থাকায় অন্যদের মতো বিপাকে পড়ছেন তিনিও।

চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার বাসিন্দা ফেরদৌস আরা Q24news কে জানান, হজমজনিত রোগে প্রতি ৫ দিনে ১০টি মেবিস ট্যাবলেট খেতে হয় তাকে। যা কিনতে হচ্ছে ১৮৫ টাকায়। অথচ এ ওষুধ বছরের শুরুতে বিক্রী হয়েছিল ১১০ টাকায়। ২০১২ সালে দাম বাড়ার আগে এ ওষুধ বিক্রী হয়েছিল ৫৫ টাকায়।

তারা বলেন, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম নাগালের বাইরে। তম্মধ্যে দফায় দফায় ওষুধের দাম বেড়ে যাওয়ায় নাভিশ্বাস ফেলছি।

জানা যায়, দাম বাড়ানোর শীর্ষে রয়েছে বেক্সিমকো ফার্মা, স্কয়ার, ইনসেপ্টা, একমি ও এসিআই। এসব কোম্পানীর নকল ওষুধও রয়েছে বাজারে। দাম বাড়ার কারণে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী মানহীন নকল ওষুধ বাজারে ছাড়ছে। বেশি মুনাফার লোভে এসব ওষুধ বিক্রী করছে বিক্রেতারাও। সম্প্রতি অভিযান চালিয়ে নগরীর বহদ্দারহাটের ৮টি ওষুধের দোকান থেকে বিপুল পরিমাণ নকল ওষুধ জব্দ করে চট্টগ্রাম র‌্যাব-৭ এর সদস্যরা।

জানতে চাইলে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড চট্টগ্রাম বিভাগের জৈষ্ট্য আঞ্চলিক বিপণন কর্মকর্তা মঈনুল ইসলাম মজুমদার Q24news কে বলেন, ২০১২ সালের শেষদিকে ডলারের দাম বাড়ায় ওষুধের দামও বাড়ে। সম্প্রতি ডলারের দাম আবারও বেড়েছে। তাই ওষুধের দামও বাড়ছে।

তিনি বলেন, উৎপাদনসহ যাবতীয় খরচ বেড়ে যাওয়ায় ওষুধের দাম বৃদ্ধি করতে আমরা বাধ্য হচ্ছি। শুধু বেক্সিমকো নয়, প্রায় সব কো¤পানি ওষুধ শিল্প সমিতি ও ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অনুমতিক্রমে ওষুধের দাম বাড়িয়েছে।

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর চট্টগ্রামের ওষুধ তত্ত্বাবধায়ক কে এম মুহসীনিন মাহবুব এ প্রসঙ্গে Q24news কে বলেন, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করে না। কো¤পানিগুলো নিজেরাই মূল্য নির্ধারণ করে। এ ক্ষেত্রে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কিছুই করার নেই।

চট্টগ্রাম মহানগরীর বৃহত্তম পাইকারি বাজার হাজারী লেইন ও চমেক হাসপাতাল এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, একই মানের হলেও কো¤পানিভেদে ওষুধ বিক্রি হচ্ছে একেক রকম দামে। অতিপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক সিপ্রোফ্লক্সাসিন গ্রুপগুলোর মধ্যে বেক্সিমকোর নিওফ্লক্সিন, স্কয়ারের সিপ্রোসিন ৫০০মিলিগ্রাম ট্যাবলেট প্রতিটি ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যা বছরের শুরুতে বিক্রয় হত ২৫ টাকায়। ২০১২ সালের শেষেও এ ট্যাবলেট বিক্রয় হয়েছে ১৩ টাকায়। লিব্যাক (৫০০ মিলিগ্রাম) ক্যাপসুলের প্রতিটির দাম ১২ টাকা থেকে ২৮ টাকায়, লিব্যাক সিরাপ ৬০টাকা থেকে বেড়ে বিক্রয় হচেছ ১৬০ টাকায়।

স্কয়ার, বেক্সিমকো, এসিআই, এসকেএফসহ অধিকাংশ কো¤পানির প্রতিটি রেনিটিডিন ট্যাবলেটের মূল্য আড়াই টাকা থেকে বেড়ে এখন ৭ টাকায়, প্যারাসিটামল-ক্যাফেইন গ্রুপের মধ্যে স্কয়ারের এইচপ্লাস ও বেক্সিমকোর নাপাএক্সট্রা ট্যাবলেট প্রতিপাতার দাম ১৫ টাকা থেকে বেড়ে ২৭ টাকায় বিক্রয় হচ্ছে।

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য স্কয়ার ফার্মাসিউটিকেলসের ইনফরমেট-৫০০ প্রতিপাতা বেড়ে ৩৭ টাকায় বিক্রয় হচ্ছে। বছরের শুরুতে এ ট্যাবলেট প্রতিপাতা বিক্রয় হতো ২৬ টাকায়। বেক্সিমকোর ডায়ারিল ১ মিলিগ্রাম ও স্কয়ারের সেকরিন ১ মিলিগ্রাম প্রতিটি ট্যাবলেটের দাম এক মাস আগে ছিল ৩ টাকা, এখন তা বেড়ে হয়েছে ৭ টাকা ৫০ পয়সা। একই কো¤পানির শ্বাসকষ্টজনিত কাঁশির সিরাপ টোফেন বছরের শুরুতে ছিল ৪৫ টাকা, এখন তা হয়েছে ৮৫ টাকা।

একইভাবে এ কো¤পানির উৎপাদিত এক হাজার মিলিলিটার ভেক্সাকোয়া ডিএস আইভি স্যালাইনের দাম ছিল ৬৮ টাকা, বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ১৩৫ টাকায়। গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ ওমিপ্রাজল। এই গ্রুপের স্কয়ার, বেক্সিমকো, একমিসহ সব কো¤পানির প্রতি ক্যাপসুলের দাম চার টাকা থেকে বেড়ে এখন ৭-৮ টাকায় বিক্রয় হচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কোনো ঘোষণা ছাড়াই কো¤পানিগুলো ওষুধের দাম বাড়াচ্ছে। ফলে খুচরা পর্যায়েও বেশি দামে ওষুধ বিক্রি করতে হচ্ছে। পাইকারি ব্যবসায়ীরাও ওষুধের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে নির্ধারিত খুচরা মূল্যের চেয়েও অধিক দাম নিচ্ছে। ফলে ক্রেতাদের সাথে আমাদের প্রতিনিয়ত বচসা হচ্ছে।

পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, এভাবে ওষুধের দাম বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। তাদের অভিযোগ, সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ ছাড়াই কো¤পানিগুলো ওষুধের দাম বাড়িয়ে বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে।

হাজারী লেইনের লোকনাথ ফার্মেসির মালিক সুরজিত সাহা Q24news কে বলেন, প্রতি তিনমাস অন্তর ৩০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত ওষুধের দাম বাড়াচ্ছে কো¤পানিগুলো। ফলে আমাদেরকেও বেশি দামে ওষুধ বিক্রি করতে হচ্ছে। তবে নকল ওষুধ বিক্রয়ের সাথে তার সম্পৃক্ত নয় বলে দাবি করেন তিনি।