চলতি বছরে ১৫ খুন ৫০ অপহরণসহ বেসামাল চাঁদাবাজি : আতঙ্কের লোকালয়ে উৎকন্ঠিত...

চলতি বছরে ১৫ খুন ৫০ অপহরণসহ বেসামাল চাঁদাবাজি : আতঙ্কের লোকালয়ে উৎকন্ঠিত পাহাড়বাসী

140
SHARE

চলতি বছরে ১৫ খুন ৫০ অপহরণসহ বেসামাল চাঁদাবাজি : আতঙ্কের লোকালয়ে উৎকন্ঠিত পাহাড়বাসী। (মোঃআহসান উল্লাহ): পাহাড় আর দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ। তাতেই অনিন্দ্য সুন্দরের এক বিশাল ক্যানভাস যেন তিন পার্বত্য জেলা। তবে, এমন মোহনীয় সৌন্দর্য আর সম্ভাবনার আড়ালে পাহাড় এখন যেন এক আতংকের জনপদ। যেখানে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি আর গুম-খুন-অপহরনে এক ভীতিকর অবস্থা পাহাড়জুড়ে। গুম, খুন, অপহরন আর সর্বগ্রাসী চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ডে পাহাড়ি জনপদ দিন দিন পরিণত হচ্ছে সন্ত্রাসের রাম রাজত্বে । এতে একদিকে, পাহাড়ে যেমন শান্তি নষ্ট হচ্ছে অন্যদিকে, হুমকির মুখে পড়ছে পর্যটন শিল্প। অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবিতে এখন তাই একাট্টা পাহাড়ি বাঙ্গালী সবাই। সরকারি হিসেবে এবং বিভিন্ন মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যে জানাগেছে, বিগত এক বছরে বৈচিত্র্যময় জেলা রাঙামাটিতে ১৫ জনকে খুন করার পাশাপাশি অর্ধশত লোককে অপহরণ করেছে আঞ্চলিকদলীয় পাহাড়ি সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। তবে রাঙামাটি পুলিশের হিসেব মতে চলতি বছরে ১২টি খুনের ঘটনা ঘটেছে বলে পুলিশের দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে। এই মাসেই খুনের তালিকায় সর্বশেষ যোগ হয়েছে আরো তিনটি নিহতের ঘটনায়। তারমধ্যে গত ৫ই ডিসেম্বর সন্ধ্যায় রাঙামাটি জেলা আওয়ামীলীগের নেতা ও জুড়াছড়ি উপজেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অরবিন্দু চাকমা, একইদিনে জেলার নানিয়ারচরে স্ব-জাতি সন্ত্রাসীদের গুলিতে নির্মমভাবে নিহত হয় সাবেক জনপ্রতিনিধি অনধি রঞ্জন চাকমা। এই দুইটি ঘটনার মাত্র দশদিন পর ১৬ই ডিসেম্বর সদর উপজেলাধীন বন্দুকভাঙ্গা এলাকায় সশস্ত্র পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হয়, অনল বিকাশ চাকমা ওরফে প্লুটো চাকমা। সে ইউপিডিএফ এর বন্দুকভাঙ্গা ইউনিয়নের সংগঠকের দায়িত্বে ছিলো বলে জানাগেছে। অপরদিকে, বিগত বছর গুলোতে খুন-গুমের ঘটনা থেমে থেমে চললেও চলতি বছরের শেষাংশে এসে খুন-গুমের ঘটনা হঠাৎ করেই বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে অপহরনের ঘটনা। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এবং চাঁদা আদায়ের কারনে সংগঠিত অপহরণ ঘটনাগুলোর অধিকাংশেরই কোনো মামলা দায়ের হয়না স্থানীয় থানাগুলোতে। প্রাণের ভয়ে ভূক্তভোগীরা মামলা থেকে দূরে থাকে বলে অনেকেই জানিয়েছেন। যারফলে এই হিসেব পুলিশের খাতায় তেমন একটা উঠে আসেনা। পুলিশের সূত্রমতে রাঙামাটিকে প্রাপ্ত অভিযোগের ভিত্তিতে অহরনের ঘটনা ঘটেছে মাত্র ৫টি। বিভিন্ন সংস্থার হিসেবে রাঙামাটিতে অহরণের শিকার হয়েছে সাধারণ মানুষ ও জনপ্রতিনিধি মিলে অন্তত অর্ধশত লোকজন। অপহরণের মিছিলে সর্বশেষ যোগ হয়েছে ২১ ডিসেম্বর দুপুরে নানিয়ারচর উপজেলার অন্তত ২২ ইউপি সদস্যকে সদর উপজেলাধীন বন্দুকভাঙ্গার ভাঙ্গামোড়া এলাকায় ডেকে নিয়ে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা। এই ঘটনার পরবর্তী দুইদিনে সকলকে ছেড়ে দেওয়ার খবর পাওয়া গেলেও কেউই মুখ খুলছেনা। রাঙামাটির পুলিশ সুপার সাঈদ তারিকুল হাসান এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের কাছে যারা অভিযোগ করেন সেগুলোর হিসেবই রয়েছে। এই মোতাবেক ব্যবস্থাও আমরা নিয়েছি। তিনি বলেন অবৈধ অস্ত্রধারিদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ অভিযান চলমান রয়েছে। অভিযোগ আছে, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কলা, আনারস, কাঠাল বিক্রি থেকে শুরু করে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রতিটি ক্ষেত্রেই সন্ত্রাসীদের বিপুল অংকের চাঁদা দিতে হয়। তাতে, জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠলেও তা নিয়ে মুখ খুলতে ভয় ভূক্তভোগীদের। বিগত কয়েক বছরের তুলণায় অত্যাধিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে চাঁদাবাজি। স্থানীয়ভাবে কাজ করা বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ করে জানাগেছে, বিগত কয়েক বছরের তুলনায় বর্তমানে পাহাড়ে আগের বছরগুলোর তুলনায় অন্তত ৫ গুণ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে অবৈধ চাঁদাবাজি। স্থানীয়দের তথ্য মতে, শুধু রাঙ্গামাটিতেই বছরে প্রায় ৩০ কোটি টাকার চাঁদাবাজি হয়। এই চাঁদাবাজির ভাগবাটোয়ারার কারনেই সম্প্রতি আরো একটি সংগঠনের আবির্ভাব ঘটেছে পার্বত্যাঞ্চলে। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর পার্বত্য চট্টগ্রামে বিপুল পরিমান চাঁদা আদায়ের কারনেই অত্রাঞ্চলের এক শ্রেণীর উপজাতীয় সন্ত্রাসী তাদের অবৈধ অস্ত্রের মাধ্যমে বছরের পর বছর চাঁদা আদায় করে সেগুলো দিয়ে ক্রয় করছে বিপুল পরিমান অবৈধ অস্ত্র। এই অস্ত্রের অহরহ ব্যবহারের কারনেই পাহাড়ে বন্ধ হচ্ছে না সশস্ত্র কার্যক্রম। আঞ্চলিক দলীয় সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র কার্যক্রমের বিরুদ্ধে অতিষ্ট হয়ে এবার মুখ খুলছেন স্বয়ং সরকারদলীয় নেতৃবৃন্দ। শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের নামে পার্বত্য চট্টগ্রামকে চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে এখানকার আঞ্চলিক দলগুলো এমন অভিযোগ করে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কার্যকরি কমিটির সদস্য রাঙামাটি জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি দীপংকর তালুকদার বলেন, প্রধানমন্ত্রীর একান্ত ইচ্ছায় পার্বত্য শান্তিচুক্তি করা হয়েছিলো। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় এসে আমরা দেখতে পাচ্ছি চুক্তি সম্পাদনকারী দল জেএসএস তাদের আগেকার মতো সশস্ত্র কার্যক্রম বন্ধ না করে উল্টো সশস্ত্র কার্যক্রম বৃদ্ধি করে পাহাড়ে সন্ত্রাসীদের রাম-রাজত্ব কায়েম করেছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে শান্তি প্রতিষ্ঠা কখনো সম্ভব নয়। তাই পার্বত্য শান্তিচুক্তির পূর্নাঙ্গ বাস্তবায়ন করতে হলে পাহাড়ে সর্বাজ্ঞে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি বন্ধ করতে হবে। তিনি বলেন অস্ত্রের ব্যবহারে সশস্ত্র সন্ত্রাসী কার্যক্রম আর শান্তি প্রক্রিয়া একসাথে কখনো চলতে পারে না। এদিকে, জাতীয় সংসদের ৩৩৩নং সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ফিরোজা বেগম চিনু বলেছেন, পার্বত্য চুক্তির বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি জেএসএস এর সভাপতি ও আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তু লারমা ঢাকায় বসে ঘোষণা দেওয়ার পরপরই রাঙামাটিতে তিনটি হত্যার ঘটনা ঘটলো এবং আওয়ামীলীগের বিলাইছড়ি উপজেলার সহ-সভাপতি রাসেল মারমা ও মহিলা আওয়ামীলীগ নেত্রী ঝর্ণা চাকমাকে হত্যার চেষ্ঠা চালিয়ে গুরুত্বর আহত করেছে উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা। প্রতিনিয়ত আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে জেএসএস এর সন্ত্রাসীরা। তিনি বলেন, পাহাড়ে সন্ত্রাসী চাঁদাবাজদের অব্যাহত সশস্ত্র কার্যক্রম।